Blog Category

আমার বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ

by / Thursday, 18 July 2013 / Published in Humayun Ahmed Sir
humayan

আমার বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ

মুহম্মদ জাফর ইকবাল | ১৮ জুলাই ২০১৩ ১০:০৩ অপরাহ্ন

হুমায়ূন আহমেদ আমার বড় ভাই তাকে নিয়ে নৈর্ব্যক্তিকভাবে কিছু লেখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, যেটাই লিখি তার মাঝে ব্যক্তিগত কথা চলে আসবে, আশা করছি পাঠকেরা সে জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন।

হুমায়ুন আহমেদ এই দেশের একজন বিখ্যাত মানুষ ছিল, বিখ্যাত মানুষেরা সবসময় দূরের মানুষ হয়, সাধারণ মানুষের কাছে তাদের পৌঁছানোর সুযোগ থাকে না। হুমায়ূন আহমেদ মনে হয় একমাত্র ব্যতিক্রম, কমবয়সী তরুণেরা তার বই থেকে বই পড়া শিখেছে, যুবকেরা বৃষ্টি আর জোছনাকে ভালোবাসতে শিখেছে, তরুণীরা অবলীলায় প্রেমে পড়তে শিখেছে, সাধারণ মানুষেরা তার নাটক দেখে কখনও হেসে ব্যাকুল কিংবা কেঁদে আকুল হয়েছে।

(হুমায়ূন আহমেদ কঠিন বুদ্ধিজীবীদেরও নিরাশ করেনি, সে কীভাবে অপসাহিত্য রচনা করে সাহিত্যজগৎকে দূষিত করে দিচ্ছে তাদের সেটা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ করে দিয়েছে!) হুমায়ূন আহমেদ শুধু বিখ্যাত হয়ে শেষ করে দেয়নি সে অসম্ভব জনপ্রিয় একজন মানুষ ছিল। আমিও সেটা জানতাম কিন্তু তার জনপ্রিয়তা কত বিশাল ছিল সেটা আমি নিজেও কখনও কল্পনা করতে পারিনি। তার পরিমাপটা পেয়েছি সে চলে যাওয়ার পর (আমি জানি এটি একধরনের ছেলেমানুষী, কিন্তু মৃত্যু কথাটি কেন জানি বলতে পারি না, লিখতে পারি না।)

ছেলেবেলায় বাবা-মা আর ছয় ভাইবোন নিয়ে আমাদের যে সংসারটি ছিল সেটি প্রায় রূপকথার একটি সংসার। একাত্তরে বাবাকে পাকিস্তানি মিলিটারিরা মেরে ফেলার পর প্রথমবার আমরা সত্যিকারের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিলাম। সেই দুঃসময়ে আমার মা কীভাবে বুক আগলে আমাদের রক্ষা করেছিলেন, সেটি এখনও আমার কাছে রহস্যের মতো। পুরো সময়টা আমরা রীতিমতো যুদ্ধ করে টিকে রইলাম। কেউ যদি সেই কাহিনিটুকু লিখে ফেলে সেটা বিভুতিভুষণ বন্দোপাধ্যায়ের উপন্যাসের মতো হয়ে যাবে। তখন লেখাপড়া শেষ করার জন্য প্রথমে আমি তারপর হুমায়ূন আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছি। হুমায়ূন আহমেদ আগে, আমি তার অনেক পরে দেশে ফিরে এসেছি। হুমায়ূন আহমেদের আগেই সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি ছিল, ফিরে এসে সে যখন লেখালেখির পাশাপাশি টেলিভিশনের নাটক লেখা শুরু করল, হঠাৎ করে তার জনপ্রিয়তা হয়ে গেল। আকাশ ছোঁয়া। দেশে ফিরে এসে প্রথমবার বইমেলায় গিয়ে তার জনপ্রিয়তার একটা নমুনা দেখে আমি হতবাক হয়ে গেলাম!

এতদিনে আমাদের ভাইবোনেরা বড় হয়েছে, সবারই নিজেদের সংসার হয়েছে। বাবা নেই, মা আছেন সবাইকে নিয়ে আবার নতুন এক ধরনের পরিবার। হুমায়ূন আহমেদের হাতে টাকা আসছে, সে খরচও করছে সেভাবে। ভাইবোন তাদের স্বামী-স্ত্রী, ছেলেমেয়ে সবাইকে নিয়ে সে দিল্লি না হয় নেপাল চলে যাচ্ছে। ঈদের দিন সবাই মিলে হৈচৈ করছে– সবকিছু কেউ যদি গুছিয়ে লিখে ফেলে আবার সেটি একটি উপন্যাস হয়ে যাবে একেবারে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস!

একসময় আমাদের সেই হাসিখুশি জীবনে আবার বিপর্যয় নেমে এল। তিন মেয়ে আর এক ছেলে নিয়ে ভাবী আর হুমায়ূন আহমেদের বিয়ে ভেঙে গেল। কেন ভেঙে গেল, কীভাবে ভেঙে গেল, সেটি গোপন কোনো বিষয় নয়, দেশের সবাই সেটি জানে। আমি তখন একদিন হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে দেখা করে তাকে বললাম, “দেখো, তুমি তো এ দেশের একজন খুব বিখ্যাত মানুষ। তোমার যদি শরীর খারাপ হয় তাহলে দেশের প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত তোমাকে দেখতে চলে আসেন। তোমার তুলনায় ভাবী তার ছেলেমেয়ে নিয়ে খুব অসহায়– তার কেউ নেই। তোমার যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আমি টিংকুভাবীর সঙ্গে থাকি? তোমার তো আর আমার সাহায্যের দরকার নেই! ছেলেমেয়ে নিয়ে ভাবীর হয়তো সাহায্যের দরকার।

হুমায়ূন আহমেদ আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, “ঠিক আছে। তুই টিংকুর সঙ্গে থাক।”

সেই থেকে আমরা টিংকুভাবীর সঙ্গে ছিলাম, তার জন্য সে রকম কিছু করতে পারিনি। শুধু হয়তো মানসিকভাবে পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। ভাইয়ের স্ত্রী না হয়েও যেন আমাদের পরিবারের একজন হয়ে থাকতে পারে, সবাই মিলে সেই চেষ্টাই করেছি। খুব স্বাভাবিকভাবে ধীরে ধীরে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে একটা দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করেছিল। মায়ের কাছ থেকে তার খবর ‍নিই, বেশিরভাগ সময় অবশ্যি খবরের কাগজেই তার খবর পেয়ে যাই। সে অনেক বিখ্যাত, অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। তার জীবন অনেক বিচিত্র, সেই জীবনের কিছু কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে তার উপর যে অভিমান হয়নি তা নয়, দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেনে নিয়েছি। পরিবর্তিত জীবনে তার চারপাশে অনেক শুভাকাঙ্খি, তার অনেক বন্ধু, তার অনেক ক্ষমতা, তার এই নতুন জীবনে আমার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়নি।

গত বছর এ রকম সময়ে হঠাৎ করে মনে হল, এখন তার পাশে আমার থাকা প্রয়োজন। ক্যান্সারের চিকিৎসা করার জন্য নিউ ইয়র্ক গিয়েছে, সবকিছু ভালোভাবে হয়েছে। শেষ অপারেশনটি করার আগে দেশ থেকে ঘুরে গেল, সুস্থ সবল একজন মানুষ। যখন অপারেশন হয় প্রতি রাত ফোন করে খোঁজ নিয়েছি। সফল অপারেশন করে ক্যান্সারমুক্ত সুস্থ একজন মানুষ বাসায় তার আপনজনের কাছে ফিরে গেছে, এখন শুধু দেশে ফিরে আসার অপেক্ষা। তারপর হঠাৎ করে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল, সার্জারিপরিবর্তিত অবিশ্বাস্য একটি জটিলতার কারণে তাকে আবার হাসপাতালে ফিরে যেতে হল। আমি আর আমার স্ত্রী চব্বিশ ঘণ্টার নোটিসে নিউ ইয়র্কে হাজির হলাম। ব্রুকলিন নামের শহরে আমার ছেলেমেয়েরা আমাদের জন্য একটা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করে রেখেছে। সেখানে জিনিসপত্র রেখে বেলভিউ হাসপাতালে ছুটে গেলাম। প্রকাশক মাজহার আমাদের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে নিয়ে গেলেন, সেখানে তার স্ত্রী শাওনের সঙ্গে দেখা হল। ওর বিছানায় নানা ধরনের যন্ত্রপাতি হুমায়ূন আহমেদকে ঘিরে রেখেছে। তাকে ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। অবস্থা একটু ভালো হলে তাকে জাগিয়ে তোলা হবে।

আমরা প্রতিদিন কাকভোরে হাসপাতালে যাই। সারাদিন সেখানে অপেক্ষা করি, গভীর রাতে ব্রুকলিনে ফিরে আসি। হুমায়ূন আহমেদকে আর জাগিয়ে তোলা হয় না। আমি এত আশা করে দেশ থেকে ছুটে এসেছি, তার হাত ধরে চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলব, অভিমানের যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল– মুহূর্তে সেই দূরত্ব দূর হয়ে যাবে। কিন্তু সেই সুযোগটা পাই না।

ইনটেনসিভ কেয়ারের ডাক্তারদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। এতদিনে তারা বিছানায় অসহায়ভাবে শুয়ে থাকা মানুষটির গুরুত্বের কথাও জেনে গেছে। তারা আমাকে বলল, “হুমায়ূন আহমেদ ঘুমিয়ে থাকলেও তারা তোমাদের কথা শুনতে পায়। তার সঙ্গে কথা বলো।”

তাই যখন আশপাশে কেউ থাকে না তখন আমি তার সঙ্গে কথা বলি। আমি তাকে বলি– দেশের সব মানুষ, সব আপনজন তার ভালো হয়ে ওঠার জন্য দোয়া করছে। আমি তাকে মায়ের কথা বলি, ভাইবোনের কথা বলি, ছেলেমেয়ের কথা বলি। সে যখন ভালো হয়ে যাবে তখন তার এই চেতন-অচেতন রহস্যময় জগতের বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে কী অসাধারণ বই লিখতে পারবে তার কথা বলি। তার কাছে সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হলেও এটা যে স্বপ্ন নয় আমি তাকে মনে করিয়ে দিই, দেশ থেকে চলে এসে এখন আমি যে তার পাশে দাঁড়িয়ে আছি এটা যে সত্যি, সেটা তাকে বিশ্বাস করতে বলি।

ঘুমন্ত হুমায়ূন আহমেদ আমার কথা শুনতে পারছে কি না, সেটা জানার কোনো উপায় নেই। কিন্তু আমি বুঝতে পারি সে শুনছে। কারণ তার চোখ থেকে ফোটা ফোটা চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে। আমি অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকি।

একদিন হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে ছোট মেয়ে বিপাশা তার বাবাকে দেখতে এল। যে কারণেই হোক বহুকাল তারা বাবার কাছে যেতে পারেনি। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে সে যখন গভীর মমতায় তার বাবার কপালে হাত রেখে তাকে ডাকল, কানের কাছে মুখ রেখে ফিসফিস করে কথা বলল, আমরা দেখলাম আবার তার দুই চোখ থেকে ফোটা ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল। সৃষ্টিকর্তা আমাদের অনেক কিছু দিয়েছেন, মনে হয় সে জন্যই এই দুঃখগুলো দিতেও কখনও কার্পণ্য করেনি।

১৯ জুলাই অন্যান্য দিনের মতো আমি হাসপাতালে গিয়েছি, ভোরবেলা হঠাৎ করে আমার মা আমাকে ফোন করলেন। ফোন ধরতেই আমার মা হাহাকার করে বললেন, “আমার খুব অস্থির লাগছে! কী হয়েছে বল।”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “কী হবে? কিছুই হয়নি। প্রত্যেকদিন যে রকম, হাসপাতালে আমি আজকেও এসেছি। সবকিছু অন্যদিনের মতো, কোনো পার্থক্য নেই।”

আমার মায়ের অস্থিরতা তবুও যায় না, অনেক কষ্ট করে তাকে শান্ত করে ফোনটা রেখেছি ঠিক সঙ্গে সঙ্গে আমার কাছে খবর এল, আমি যেন এই মুহূর্তে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে যাই। হুমায়ূন আহমেদ মারা যাচ্ছে। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র, তথ্য কেমন করে পাঠানো সম্ভব তার সকল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আমি জানি। কিন্তু পৃথিবীর অপর পৃষ্ঠ থেকে একজন মা কেমন করে তার সন্তানের মৃত্যুক্ষণ নিজে থেকে বুঝে ফেলতে পারে আমার কাছে তার ব্যাখ্যা নেই।

আমি দ্রুত ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে গিয়েছি। হুমায়ূন আহমেদের কেবিনে সকল ডাক্তার ভিড় করেছে। তার চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা ড. মিরারও আছেন। আমাদের দেখে অন্যদের বললেন, “আপনজনদের কাছে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দাও।”

আমি বুঝতে পারলাম হুমায়ূন আহমেদকে বাঁচিয়ে রাখার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে এখন তাকে চলে যেতে দিতে হবে।

আমার স্ত্রী ইয়াসমিন আমাকে বলল, আমার মাকে খবরটা দিতে হবে।

১৯৭১ সালে আমি আমার মাকে আমার বাবার মৃত্যু সংবাদ দিয়ে তার সারাটা জীবন ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছিলাম। এতদিন পর আবার আমি নিষ্ঠুরের মতো তাকে তার সন্তানের আসন্ন মৃত্যুর কথা বলব? আমি অবুঝের মতো বললাম, “আমি পারব না।”

ইয়াসমিন তখন সেই নিষ্ঠুর দায়িত্বটি পালন করল– মুহূর্তে দেশে আমার মা-ভাইবোন সব আপনজনের হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে সব স্বপ্ন সব আশা এক ফুৎকারে নিভে গেল।

কেবিনের ভেতর উঁচু বিছানায় শুয়ে থাকা হুমায়ূন আহমেদকে অসংখ্য যন্ত্রপাতি বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। তার কাছে শাওন দাঁড়িয়ে আকুল হয়ে ডেকে হুমায়ূন আহমেদকে পৃথিবীতে ধরে রাখতে চাইছে। আমরা বোধশক্তিহীন মানুষের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। যে তরুণ ডাক্তার এতদিন প্রাণপণ চেষ্টা করে এসেছে সে বিষণ্ন গলায় আ্মাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করল। বলল, “আর খুব বেশি সময় নেই।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ও কি কষ্ট পাচ্ছে?”

তরুণ ডাক্তার বলল, “না কষ্ট পাচ্ছে না।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কেমন করে জান?”

সে বলল, “আমরা জানি। তাকে আমরা যে ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছি তাতে তার কষ্ট হওয়ার কথা নয়। এ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। এ রকম অবস্থা থেকে যখন কেউ ফিরে আসে তাদের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তার এখন কেমন লাগছে?”

সে বলল, “স্বপ্ন দেখার মতো। পুরো বিষয়টা তার কাছে মনে হচ্ছে একটা স্বপ্নের মতো।”

একটু পরে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “যদি কোনো জাদুমন্ত্রবলে হঠাৎ সে জ্ঞান ফিরে পায়, হঠাৎ সে বেঁচে ওঠে– তাহলে কি সে আবার হুমায়ুন আহমেদ হয়ে বেঁচে থাকবে?”

তরুণ ডাক্তার বলল, “এখন যদি জেগে ওঠে, তাহলে হবে; একটু পরে আর হবে না। তার ব্লাড প্রেশার দ্রুত কমছে, তার মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কমছে, মস্তিষ্কের নিউরন সেল ধীরে ধীরে মারা যেতে শুরু করেছে।”

আমরা সবাই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। কমবয়সী তরুণী একজন নার্স তার মাথার কাছে সবগুলো যন্ত্রপাতির কাছে দাঁড়িয়ে আছে। হুমায়ূন আহমেদের জীবনের শেষ মুহূর্তটি যেন কষ্টহীন হয়, তার নিশ্চয়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

চারপাশে ঘিরে থাকা যন্ত্রপাতিগুলো এতদিন তাকে বাঁচিয়ে রেখে যেন ক্লান্ত হয়ে গেছে। একটি একটি যন্ত্র দেখাচ্ছে খুব ধীরে ধীরে তার জীবনের চিহ্নগুলো মুছে দিতে শুরু করেছে। ব্লাড প্রেশার যখন আরও কমে এসেছে, আমি তখন তরুণ ডাক্তারকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, “এখন? এখন যদি হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে ওঠে তাহলে কী হবে?”

ডাক্তার মাথা নেড়ে বলল, “যদি এখন অলৌকিকভাবে তোমার ভাই জেগে ওঠে সে আর আগের মানুষটি থাকবে না। তার মস্তিষ্কের অনেক নিউরণ সেল এরমধ্যে মারা গেছে।”

আমি নিঃশব্দে হুমায়ূন আহমেদকে এই পৃথিবী থেকে বিদায় জানালাম। তার দেহটিতে এখনও জীবনের চিহ্ন আছে। কিন্তু আমার সামনে যে মানুষটি শুয়ে আছে সে আর অসম্ভব সৃষ্টিশীল, অসাধারণ প্রতিভাবান হুমায়ূন আহমেদ নয়। যে মস্তিষ্কটি তাকে অসম্ভব একজন সৃষ্টিশীল মানুষ করে রেখেছিল, তার কাছে সেই মস্তিষ্কটি আর নেই। সেটি হারিয়ে গেছে।

তরুণ ডাক্তার একটু পর ফিসফিস করে বলল, “এখন তার হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত হতে থাকবে।”

সত্যি সত্যি তার হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত হতে থাকল। ডাক্তার একটু পর বলল, “আর মাত্র কয়েক মিনিট।”

আমি বোধশক্তিহীন মানুষের মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম, এবারে একটু কাছে গিয়ে তাকে ধরে রাখলাম। যে যন্ত্রটি এতদিন তার হৃৎস্পন্দন স্পন্দিত করে এসেছে, এটা শেষবার একটা ঝাঁকুনি দিয়ে চিরদিনের মতো থেমে গেল। মনিটরে শুধু একটি সরল রেখা, আশ্চর্য রকম নিষ্ঠুর একটি সরল রেখা। হুমায়ূন আহমদের দেহটা আমি ধরে রেখেছি কিন্তু মানুষটি চলে গেছে।

ছোট একটি ঘরের ভেতর কী অচিন্ত্যনীয় বেদনা এসে জমা হতে পারে আমি হতবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলাম।
২.
আমি আর ইয়াসমিন ঢাকা ফিরেছি বাইশ তারিখ ভোরে। এয়ারপোর্ট থেকে বের হওয়ার আগেই অসংখ্য টেলিভিশন ক্যামেরা আমাদের ঘিরে ধরল, আমি নতুন করে বুঝতে পারলাম, হুমায়ূন আহমেদের জন্য শুধু তার আপনজনেরা নয়, পুরোদেশ শোকাহত।

এর পরের কয়েকদিনের ঘটনা আমি যেটুকু জানি এই দেশের মানুষ তার থেকে অনেক ভালো করে জানে। একজন লেখকের জন্য একটা জাতি এভাবে ব্যাকুল হতে পারে, আমি নিজের চোখে না দেখলে কখনও বিশ্বাস করতাম না। কোথায় কবর দেওয়া হবে সেই সিদ্ধান্তটি শুধু আপনজনদের বিষয় থাকল না। হঠাৎ করে সেটি সারাদেশের মানুষের আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়াল। টেলিশিনের সব চ্যানেল একান্তই একটা পারিবারিক বিষয় চব্বিশ ঘণ্টা দেখিয়ে গেছে এতদিন, আমার সেটাও বিশ্বাস হয় না। পরে আমি অনেককে প্রশ্ন করে বুঝতে চেয়েছি এটা কি একটা স্বাভাবিক বিষয়, নাকি মিডিয়াদের তৈরি করা একটা কৃত্রিম ‘হাইপ’। সবাই বলেছে এটি ‘হাইপ’ ছিল না, দেশের মানুষ সারাদিন সারারাত নিজের আগ্রহে টেলিভিশনের সামনে বসেছিল। একজন লেখকের জন্য এত তীব্র ভালোবাসা মনে হয় শুধু এই দেশের মানুষের পক্ষেই সম্ভব।
৩.
হুমায়ূন আহমেদ কি শুধু জনপ্রিয় লেখক নাকি তার লেখালেখির সাহিত্যমর্যাদাও আছে, সেটি বিদগ্ধ মানুষের একটি প্রিয় আলোচনার বিষয়। আমি সেটি নিয়ে কখনও মাথা ঘামাইনি। কারও কাছে মনে হতে পারে, দশ প্রজন্মের এক হাজার লোক একটি সাহিত্যকর্ম উপভোগ করলে সেটি সফল সাহিত্য! আবার কেউ মনে করতেই পারে তার দশ প্রজন্মের পাঠকের প্রয়োজন নেই, এক প্রজন্মের এক হাজার মানুষ পড়লেই সে সফল। কার ধারণা সঠিক সেটি কে বলবে।

আমি নিজেও যেহেতু অল্পবিস্তর লেখালেখি করি তাই আমি জানি, একজন লেখক কখনও সাহিত্য সমালোচকের মন জয় করার জন্য লিখেন না, তারা লিখেন মনের আনন্দে। যদি পাঠকেরা সেই লেখা গ্রহণ করে সেট বাড়তি পাওয়া। হুমায়ূন আহমেদের লেখা শুধু যে পাঠকেরা গ্রহণ করছিল তা নয়, তার লেখা কয়েক প্রজন্মের পাঠক তৈরি করেছিল। বড় বড় সাহিত্য সমালোচকেরা তার লেখাকে আড়ালে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছেন। কিন্তু ঈদ সংখ্যার আগে একটি লেখার জন্য তার পিছনে ঘুরঘুর করেছেন, সেটি আমাদের সবার জন্য একটি বড় কৌতুকের বিষয় ছিল।

কয়েকদিন আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনী সংস্থার কর্ণধারের সঙ্গে কথা হচ্ছে, কথার ফাঁকে একবার জিজ্ঞেস করলাম, “আপনাদের কাছে কি হুমায়ূন আহমেদের কোনো বই আছে?”

প্রশ্নটি শুনে ভদ্রলোকের মুখটি কেমন যেন ম্লান হয়ে গেল। দুর্বল গলায় জানালেন, হুমায়ূন আহমেদ যখন প্রথম লিখতে শুরু করেছে তখন সে তার একটা উপন্যাসের পা-ুলিপি নিয়ে তাদের প্রকাশনীতে এসেছিল। তাদের প্রকাশনীতে বড় বড় জ্ঞানী গুণী মানুষ নিয়ে রিভিউ কমিটি ছিল, পা-ুলিপি পড়ে রিভিউ কমিটি সুপারিশ করলেই শুধু মাত্র বইটি ছাপা হত। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসটি পড়ে রিভিউ কমিটি সেটাকে ছাপানোর অযোগ্য বলে বাতিল করে দিল। প্রকাশনীটি তাই সেই পা-ুলিপি না ছাপিয়ে হুমায়ূন আহমেদকে ফিরিয়ে দিয়েছিল!

গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনীটির কর্ণধারের মুখ দেখে আমি টের পেয়েছিলাম, তিনি তার প্রকাশনীর রিভিউ কমিটির সেই জ্ঞানী-গুণী সদস্যদের কোনোদিন ক্ষমা করেননি। করার কথাও নয়।

হুমায়ূন আহমেদ তিন শতাধিক বই লিখেছে, তার উপরও গত বছরে সম্ভবত প্রায় সমান সংখ্যক বই লেখা হয়েছে। কত বিচিত্র সেই বইয়ের বিষয়বস্তু। তার জন্য গভীর ভালোবাসা থেকে লেখা বই যে রকম আছে, ঠিক সে রকম শুধুমাত্র টু পাইস কামাই করার জন্য লেখা বইয়েরও অভাব নেই। লেখক হিসেবে আমাদের পরিবারের কারও নাম দিয়ে গোপনে বই প্রকাশ করার চেষ্টা হয়েছে। শেষ মুহূর্তে থামানো হয়েছে এ রকম ঘটনাও জানি।

হুমায়ূন আহমেদ চলে যাবার পর মানুষের তীব্র ভালোবাসার কারণে ইন্টারনেটে নানা ধরনের আবেগের ছড়াছড়ি ছিল, সে কারণে মানুষজন গ্রেপ্তার পর্যন্ত হয়েছে, হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে ছাড়াও পেয়েছে। তার মৃত্যু নিয়ে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা আছে। কাজেই কোনো কোনো বই যে বিতর্ক জন্ম দেবে তাতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। তাই আমি যখন দেখি, কোনো বইয়ের বিরুদ্ধে জ্ঞানী-গুণী মানুষেরা বিবৃতি দিচ্ছেন, সেই বই নিষিদ্ধ করার জন্য মামলা মোকদ্দমা হচ্ছে– আমি একটুও অবাক হই না। শুধু মাঝেমধ্যে ভাবি হুমায়ূন আহমেদ যদি বেঁচে থাকত তাহলে এই বিচিত্র কর্মকা- থেকে তার কী প্রতিক্রিয়া হত?

কেউ যেন মনে না করে, তাকে নিয়ে শুধু রাগ-দুঃখ-ক্ষোভ কিংবা ব্যবসা হচ্ছে, আমাদের চোখের আড়ালে, তার জন্য গভীর ভালোবাসার সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা জগৎ রয়েছে।

আমি আর আমার স্ত্রী ইয়াসমিন যখন হুমায়ূন আহমেদের পাশে থাকার জন্য নিউ ইয়র্ক গিয়েছিলাম তখন একজন ছাত্রের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। সে হুমায়ূন আহমেদের সেবা করার জন্য তার কেবিনে বসে থাকত। শেষ কয়েক সপ্তাহ যখন তাকে অচেতন করে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হল তখনও এই ছেলেটি সারারাত হাসপাতালে থাকত। হুমায়ূন আহমেদ যখন আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে, তখনও সে আমাদের সঙ্গে ছিল। সেই দিন রাতে এক ধরনের ঘোরলাগা অবস্থায় আমরা যখন নিউ ইয়র্ক শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তখনও এই ছেলেটি নিঃশব্দে আমাদের সঙ্গে হেঁটে হেঁটে গেছে।

দেশে ফিরে এসে মাঝেমধ্যে তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়। শেষবার যখন তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, সে বলেছে, এখনও মাঝেমধ্যে সে বেলভিউ হাসপাতালে গিয়ে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে বসে থাকে।

কেন বসে থাকে আমি জানি না। আমার ধারণা সে নিজেও জানে না। শুধু এইটুকু জানি, এই ধরনের অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।

মনে হয় এই ভালোবাসাটুকুই হচ্ছে জীবন।

Tagged under: ,
TOP